বাগানের মাটি নির্বাচনের এবং প্রস্তুত করার সময় একটি বিষয় অনেকেই এড়িয়ে যান এবং কম গুরুত্বের সাথে দেখেন - যা হলো মাটির পিএইচ (pH).

পিএইচ সংকেতটি রসায়ন বিজ্ঞানের ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সহজভাবে বলতে গেলে পিএইচ দিয়ে মাটির এসিডিটি (acidity) বা অম্লত্ব সম্পর্কে জানা যায়। বাগান করার ক্ষেত্রে পিএইচ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তর্ক-বিতর্ক বিদ্যমান কিন্তু উদ্ভিদের সুস্বাস্থ্যের জন্য পিএইচ বিষয়টি সঠিক পরিমাণের মাঝে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। 

সাধারণত পিএইচ এর মাত্রা কম হলে বোঝা যায় যে মাটির অম্লত্ব বেশি, পিএইচ এর মাত্রা বেশি হলে বোঝা যায় যে মাটির অম্লত্ব পরিমাণ কম এবং ক্ষারের পরিমাণ বেশি।

এই পিএইচ এর পরিমাণের সাথে বিভিন্ন উদ্ভিদের সম্পর্ক রয়েছে। আমরা জানি উদ্ভিদের বিভিন্ন পুষ্টিগুণের কারণে কোন কোন উদ্ভিদের অম্লত্ব বা অ্যাসিডিটি বেশি থাকে, আবার কোন উদ্ভিদের এসিডিটি তুলনামূলক কম থাকে।

যদিও উদ্ভিদের এসিডিটি বা অন্যদের সাথে মাটির অম্লত্ব সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই, তারপরও উদ্ভিদের পিএইচ এর মাত্রা যদি অতিরিক্ত বেশি বা কম হয় তাহলে তা উদ্ভিদের বৃদ্ধির পথে তা বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে। তাছাড়া পিএইচ এর মাত্রার উপর ভিত্তি করে মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অনুজীব যেমন ব্যাকটেরিয়া যেগুলো মাটির উর্বরতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয়, সেগুলো বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে।

তাই পরোক্ষভাবে মাটির পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করার মোটামুটি ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। খাদ্য শস্য বা বিভিন্ন সবজি চাষ করার ক্ষেত্রে চেষ্টা করা হয় পরিমাণ পিএইচ এর পরিমাণ নিউট্রাল বা ভারসাম্য অবস্থার চেয়ে কিছুটা কম অর্থাৎ সামান্য এসিডিক হিসেবে ধরে রাখা হয়।

মোটামুটি ভাবে একটি উর্বর জমির মাটির পিএইচ সাধারণত ৭ এর কাছাকাছি থাকে এবং ৭ হচ্ছে পিএইচ এর নিউট্রাল বা সাম্যাবস্থা। 

পিএইচ নির্ণয়

পিএইচ নির্ণয় এর জন্য সাধারণত ল্যাবরেটরিতে আপনার জমির মাটি পরীক্ষা বা সয়েল টেস্ট করানো হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের কিটের মাধ্যমে মাটি সংগ্রহ করে সেটা ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে মাটির পিএইচ টেস্টের ফলাফল জানা যায় 

আপনি যে ধরনের উদ্ভিদ চাষাবাদ করবেন, সেই অনুযায়ী পরবর্তীতে মাটির পিএইচ এর পরিমাণ পরিবর্তন করা সম্ভব।

তাই বাগান করা শুরু করার পূর্বে পিএইচ এর ব্যাপারে আপনি যা যা করতে পারেন, তা হলো:

এই তিনটি ধাপ অনুসরণ করার মাধ্যমে আপনি সহজেই মাটির পিএইচ এর মাত্রা কাঙ্খিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারবেন এবং তারই মাধ্যমে আপনার বাগানের উদ্ভিদগুলোর সুস্থ সবল বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবেন।

এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব বাগান করার জন্য মৌলিক কৌশল গুলোর মধ্যে সমন্বিত কীটপতঙ্গ দূরীকরণ সম্পর্কে।  সমন্বিত কীটপতঙ্গ দূরীকরণ কিভাবে হওয়া উচিৎ এবং কিভাবে হওয়া উচিত নয় সে সম্পর্কে জানা বাগান করার পূর্বে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।

বাগান করার সময় যখনই কেউ তার বাগানে কীটপতঙ্গ জনিত সমস্যার মুখোমুখি হন তখনই দেখা যায় তিনি একটি বোতল ভর্তি বিষ এর দিকে হাত বাড়ান। আপনি যদি আপনার বাগান করার সময় কীটপতঙ্গ জনিত সমস্যায় ভুগে কীটনাশক ব্যবহার করে বাগানে থাকা সমস্ত পোকামাকড় কে মারতে চান তবে যে উপকারী শিকারি গুলো এই কীটপতঙ্গ গুলোর উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে তাদের প্রাকৃতিক খাবার ব্যবস্থা কে আপনি ধ্বংস করে দিবেন। এতে করে আপনার বাগানের যে উপকারী শিকারি আপনার বাগানকে কীটপতঙ্গ থেকে রক্ষা করত সেগুলো থাকবে না। যার ফলে পরবর্তীতে আরো বেশি সংখ্যক ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ আপনার বাগানে দেখা যেতে পারে। এটি একটি স্পর্শকাতর চক্র। 

আবার অনেক সময় দেখা যায় এই কীটনাশকগুলো এতো মারাত্মক হয় যে উপকারী এই শিকারিগুলোও বাগানে কীটনাশকের ব্যবহারের কারনে মারা পড়ে। বাগানের জন্য উপকারী কীটপতঙ্গ এবং মাকড়সা যেগুলো বাগানের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করে এবং ফুলগুলোর পরাগায়ন ঘটায় সেগুলোও এই কীটনাশক ব্যবহারে মারা পড়তে পারে। এবং কোন কারণে যদি এই ব্যবহৃত কীটনাশক যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে সেখান থেকে সরে অন্য কোথাও পড়ে সে ক্ষেত্রে তা পানি এবং বাতাসকে দূষিত করে মাছ এবং পাখিরও ক্ষতি করতে পারে।

যারা অর্গানিক উপায় বাগান তৈরী করতে চান তারা সাধারণত একটি ভিন্ন ধরনের পদ্ধতিতে অগ্রসর হন। অর্গানিক উপায়ে বাগান তৈরীর সময় তারা সাধারনত কৃত্রিম উপায়ে কীটপতঙ্গের সাথে যুদ্ধ করার বদলে একটি স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুসংস্থান গড়ে তোলা চেষ্টা করে থাকেন। যদি কখনো বাগানে কীটপতঙ্গ জনিত সমস্যা তৈরি হয় তবে তারা সর্বপ্রথম যে পদ্ধতিটি সবচেয়ে কম বিষাক্ত এবং পরিবেশের জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতিকর সেটি ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।

অর্গানিক বাগান তৈরীর ক্ষেত্রে সমন্বিত উপায়ে কীটপতঙ্গ দূরীকরণের যে ব্যবস্থা সেটি সাধারনত জৈবিক, প্রাকৃতিক, সভ্যতামুলক, বাস্তব এবং রাসায়নিক পরিকল্পনার সমন্বয়ে তৈরি। সোজা কথায় এটির মানে দাঁড়াচ্ছে সবচেয়ে সহজ, পরিবেশের জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতিকর, সবচেয়ে কম খরচের প্রক্রিয়া সবার শুরুতে ব্যবহার করা এবং সবচেয়ে খরচ হয় এমন, প্রকৃতির জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর এবং বিষাক্ত পদ্ধতি একদম শেষ পরিকল্পনা হিসেবে ব্যবহার করা।

 এটি দাঁড়ালো আমাদের সমন্বিত উপায় কীটপতঙ্গ দূরীকরণের ব্যবস্থার কথা। এখন সমন্বিত কীটপতঙ্গ দূরীকরণ কিভাবে এবং কত ধাপে করতে হবে তা নিয়ে আমরা আলোচনা করব পরের আর্টিকেল এ।

সমন্বিত কীটপতঙ্গ দূরীকরণের প্রথম যে আর্টিকেলটি ছিল সেটি আমরা দেখেছি বাগান করার মৌলিক কৌশল হিসেবে সমন্বিত কীটপতঙ্গ কি এবং কতটা প্রভাব ফেলে। এখন আমরা দেখব সমন্বিত কীটপতঙ্গ দূরীকরণের জন্য যে ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয় সেগুলো কি

প্রতিরোধ

অর্গানিক বাগান তৈরীর সময় অর্ধেক যুদ্ধ আগেই জিতে যাওয়া যায় যদি প্রথমেই বাগানে কীটপতঙ্গ এবং অসুখ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেজন্য প্রতিনিয়ত গাছপালা কে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে, অপ্রয়োজনীয়' আগাছা এবং ঘাস তুলে পরিষ্কার রাখতে হবে। এছাড়া বাগানে পানি ব্যবহার করার সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। বাগান তৈরীর সময় এ কাজগুলো ঠিকঠাক মতো করলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থেকে শুরুতেই পরিত্রান পাওয়া যায়।

গাছপালা নিরীক্ষণ

বাগান করার আগে আপনাকে শুরুতেই গাছপালাতে কি ধরনের কীটপতঙ্গ আক্রমণ করে সে সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। এবং গাছপালা নিরীক্ষণ এর উপর রাখতে হবে। আপনি যদি কি ধরনের কীটপতঙ্গ গাছে আক্রমণ করতে পারে সেটি জেনে রাখেন তবে যখন বাগানে কীটপতঙ্গ দেখতে পাবেন তখন এটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। সেজন্য কি ধরনের পতঙ্গ কোন গাছে হবে সে সম্পর্কে জ্ঞান রাখা প্রয়োজন।

পদ্ধতিগত পরিবর্তন

বাগান করার সময় কিছু বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। যেমন এক বছর কোন এক ধরনের শস্য যদি উৎপাদন করা হয় তবে পরবর্তী বছর যেন অন্য ধরনের কোন শস্য সে জায়গায় লাগানো হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। কারণ এতে করে একই বছর একই প্রজাতির শস্যে যেন একই কীটপতঙ্গ আক্রমণ না করে তা নিশ্চিত করা যায়। এবং এর ফলে কীটপতঙ্গ জনিত সমস্যা গুলো কমিয়ে আনা যায়।

যান্ত্রিক কৌশল

আপনি আপনার বাগান করার সময় সর্বপ্রথম কীটপতঙ্গ যেন আপনার গাছের কোন অংশে আক্রমণ করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে পারেন। এর জন্য আপনাকে বিশেষ কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গাছ-পালা গুলোকে একটি বিশেষ বস্তু দিয়ে ঢেকে দেয়া অথবা গরম পানি, বাতাস, আগুন এবং দিয়ে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ গুলোকে মেরে ফেলা। এতে করে আপনাকে কোন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করতে হবে না। এমনকি সাবান-পানি যুক্ত তরল দিয়ে কীটপতঙ্গ গুলোকে কুপোকাত করতে পারবেন।

জৈবিক নিয়ন্ত্রণ

প্রতিটি প্রাণীরই একটি প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। প্রকৃতির এই প্রাকৃতিক নিয়ম কে ব্যবহার করে বাগান করার সময় আপনি লাভবান হতে পারেন। ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ গুলোকে ধ্বংস করার জন্য অন্য আরো বেশ কিছু পতঙ্গ রয়েছে। আপনি চাইলে আপনার বাগানে এ ধরনের উপকারী কীটপতঙ্গ যেমন শুয়োপোকা সহ আরও বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ ছাড়তে পারেন যেগুলো ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ কে ধ্বংস করবে এবং আপনার বাগানকে নিরাপদ রাখবে।

রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ 

রাসায়নিক পদার্থগুলো বাগান তৈরি করার সময় হওয়া উচিত শেষ পদক্ষেপ। এবং রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করলেও যেন সবচেয়ে কম বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাগান তৈরির সময় যদি কখনো রাসায়নিক পদার্থ যেমন কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় তবে এমন ধরনের পদার্থ ব্যবহার করতে হবে যেন তা শুধু মাত্র ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ কেই আক্রান্ত করে। বাগানের পরিবেশ রক্ষার্থে অন্য কোন গাছপালা বা প্রানীর যেন ক্ষতি না করে এই রাসায়নিক পদার্থগুলো সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এই পদ্ধতি বা ধাপগুলো অবলম্বন বাগান তৈরীর সময় একটি অন্যতম মৌলিক কৌশল হিসেবে সমন্বিত পদ্ধতিতে কীটপতঙ্গ দূর করা সম্ভব

একটি বাগানে যখন বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয় তখন সেই গাছগুলো বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণ এবং পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে। যেসব বৃক্ষ জামের মতো ফল উৎপন্ন করে সেগুলো পাখিকে আকৃষ্ট করে, যেসব গাছের ফুল মধু সমৃদ্ধ সেগুলো প্রজাপতি এবং হামিংবার্ডকে আকৃষ্ট করে। এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, কেন বাগানে এধরনের বন্যপ্রাণ কিংবা কীটপতঙ্গ আসাকে উৎসাহিত করবেন?  উত্তর হিসেবে বলা যেতে পারে আপনার বাগানে এ ধরনের বন্যপ্রাণ কিংবা কীটপতঙ্গের দরকার রয়েছে। যেসকল কীটপতঙ্গ গাছপালার জন্য উপকারী সেগুলো বাগানের গাছগুলোর যে ক্ষতিকর পোকামাকড় রয়েছে সেগুলোকে শিকার করে গাছগুলোকে রক্ষা করে। বাগানের সবচেয়ে ভালো বন্ধু গুলোর মধ্যে রয়েছে গুবরে পোকা, সিরফিড মাছি এবং ছোট্ট, বিষমুক্ত ও পরজীবী বোলতা।

বৈচিত্র্যময় বাসস্থান তৈরি করার মাধ্যমে বাগানের জন্য উপকারী প্রাণী গুলোকে উৎসাহিত করতে হবে।  বিভিন্ন প্রজাতির ফুল গাছ বাগানে লাগান। এতে করে সারা বছরই কোনো না কোনো ফুল ফুটে থাকবে। এবং পারলে বাগানে কীটনাশক ব্যবহার করবেন না কারণ সেগুলো উপকারী কীটপতঙ্গেরও ক্ষতি করে।

এছাড়া উপায় আরো যে সব উপায়ে আপনি আপনার বৈচিত্র‍্যতাকে উৎসাহিত করতে পারবেন -

বেশিরভাগ প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানে কীটপতঙ্গ এবং এদের শিকার করা প্রাণী একটি নিয়ন্ত্রিত কিন্তু গতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখে। এসব শিকারি ছাড়া এদের শিকার খুব দ্রুত হারে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে ফেলবে এবং পরবর্তীতে এ কারণে খাবারের অভাবে মারা পড়বে। আপনার বাগানে বিভিন্ন কীটপতঙ্গেরও থাকা প্রয়োজন কারণ তারা উপকারী প্রাণীগুলোর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। যদি এই উপকারী প্রাণী অথবা কীটপতঙ্গের খাবারের অভাব পড়ে সে ক্ষেত্রে তারা মারা যাবে অথবা আপনার বাগান ছেড়ে চলে যাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে এক ধরনের বিষমুক্ত বোলতা রয়েছে যেগুলো অন্য আরেক ধরনের বিষাক্ত বোলতার উপর নির্ভর করে বাঁচে। এই বিষাক্ত বোলতা গুলো বাগানের ক্ষতি করলেও বিষমুক্ত বোলতা বাগানের জন্য উপকারী। বিষমুক্ত এই বোলতাগুলো বিষাক্ত বোলতার উপর ডিম পাড়ে। এবং পরবর্তীতে ওই ডিমগুলো থেকে বোলতা গুলো বড় হতে থাকে এবং বিষাক্ত বোলতার শুয়োপোকাকে খেয়ে ফেলে। কিন্তু আপনি যদি কোনো কারণে বাগানে কীটনাশক ব্যবহার করে বিষাক্ত বোলতা কে মেরে ফেলেন সরিয়ে ফেলেন তাহলে আপনি আপনার বাগানের জন্য উপকারী যে বোলতা গুলো রয়েছে সেগুলোকেও আপনার বাগান থেকে সরিয়ে ফেলবেন। এটি আপনি ভালো নয়। তাই এ কাজগুলোর আগে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। 

অর্গানিক উপায়ে যারা বাগান তৈরী করতে চান তারা সাধারনত প্রকৃতিকে মাপকাঠি ধরে ঠিক একই রকম করে বৈচিত্র্যময় এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে থাকেন।প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো উদ্ভিদের মধ্যে বৃক্ষ, গুল্ম, একবর্ষজীবী এবং বহুবর্ষজীবী গাছ অন্তর্গত। এরকম বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা একসাথে বাগানে লাগালে প্রতিটি প্রজাতি প্রজাতিকে বেঁচে থাকতে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে।

যখন মনোকালচার এ মন কালচারের কৃত্রিমভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির গাছের বিশাল একটি কলোনি জন্মানো হয় তখন সেখানে উদ্ভিদগুলো বৈচিত্র্যময় গাছপালার প্রজাতির যে সুবিধা সেগুলো থেকে বঞ্চিত হয়। এক্ষেত্রে যখন পোকামাকড় এবং কীটপতঙ্গ একটি গাছ কে আক্রমণ করে তখন সেখান থেকে পুরো বাগানের বাকি গাছগুলোতে খুব সহজেই অসুখ ছড়িয়ে যায়। এবং এরপর গাছগুলো মাটি থেকে পুষ্টি উপাদান খুব দ্রুত গ্রাস করতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে আমেরিকান বেদারু জাতীয় বৃক্ষের কথা। এই গাছটি পুরো দেশ জুড়ে রাস্তার পাশে লাগানো হয়েছিল। কিন্তু ১৯২০ সালের শেষের দিকে যখন ডাচ বেদারু অসুখ ছড়াতে শুরু করে তখন এই অসুখ এর বাহক গুবরে পোকা গাছ থেকে গাছের শিকড়ে উড়ে গিয়ে অসুখ ছড়াতে থাকে।

অনেক কৃষক এবং যারা বাগান করেন তারা একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্যময় গাছ লাগানোর সুবিধা ভোগ করতে আগ্রহী। একই জায়গায় পরস্পরকে সহযোগিতা করে এমন গাছ লাগানো বাগান করার জন্য বেশ চমৎকার একটি দিক। আপনি আপনার বাগানে ত্রিপত্র জাতীয় গুল্ম লাগাতে পারেন। এটি বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে এর পুষ্টি উপাদান মাটিতে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়াও আপনি বড় যে গাছ গুলোর পাতা অনেক বড় এবং নিচে ছায়া হয় সেগুলোর নিচে ছায়াতে জন্মায় এমন গাছ লাগাতে পারেন। এতে করে একই সাথে আপনার বাগানের জমি ঢেকে থাকবে এবং গাছের নিচের মাটিকে ক্ষয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে। 

অর্গানিক বাগান সাধারণত নিজে থেকে একটি স্বাস্থ্যবান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুসংস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। কারণ উদ্ভিদ প্রজাতি মিলিয়ন বছর ধরে বেড়ে ওঠার নির্দিষ্ট পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করে আসছে।  যখন তাদের বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায় তখন তারা বেশ সহজ ভাবে বেড়ে ওঠে। যে গাছগুলো বাগান করার জায়গার আলো, ছায়া, পরিবেশ, মাটির ধরণ এবং মাটির আর্দ্রতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে সেগুলো যদি বাগানে লাগানো হয় তবে আপনি একটি চমৎকার সতেজ,  স্বাস্থ্য সমৃদ্ধ কীটপতঙ্গ বাগানের পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন। 

বিবেচনা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে গাছ লাগানোর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে আপনার আশেপাশের পরিবেশের আবহাওয়া সম্পর্কে আপনার জানতে হবে এবং একই সাথে আপনার আশপাশের বিশেষ দিকগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। এরপরই আপনি সফলভাবে গাছ লাগানোর জায়গায় লাগানোর জন্য গাছ ঠিক করতে পারবেন।

 সঠিক বিবেচনার মাধ্যমে আপনার বাগানে গাছ লাগানোর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হচ্ছে আপনার বাগানে যেন চাষযোগ্য স্থায়ী উদ্ভিদ প্রজাতির এবং উপকারী প্রাণীদের সমাজ গড়ে ওঠে সেটি নিশ্চিত করা। প্রকৃতিতে উদ্ভিদ এবং প্রাণী একটি বাস্তুসংস্থানে সমাজের মতন করে অবস্থান করে যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের কার্য সম্পাদন করে এবং এতে করে এক পক্ষের কাজ অপর পক্ষের জীবনকে প্রভাবিত করে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুসংস্থানে প্রতিটি গাছ এবং প্রাণী প্রজাতির যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য, পানি এবং থাকার জন্য বাসস্থান থাকা প্রয়োজন। 

একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুসংস্থানের শিকারি প্রাণীদের জন্য যথেষ্ট পরিমান শিকার রয়েছে এবং ঠিক একই ভাবে এই শিকারদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ উদ্ভিদ বা গাছপালা রয়েছে।  যখন একটি বাস্তুসংস্থানের কোন একটি অংশ মারা যায় অথবা বিলুপ্ত হয়ে যায় তখন সেই অংশটি ওপর নির্ভরশীল যেসব গাছপালা কিংবা প্রাণী রয়েছে পরিবেশে তাদের কার্যক্রম ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ যদি মৌমাছি বিলুপ্ত হয়ে যায় তবে গাছগুলোর ফুলের পরাগায়ন মৌমাছির মাধ্যমে হয়ে থাকে সেগুলোর পরাগায়ন বন্ধ হয়ে যাবে এবং ফলশ্রুতিতে এই গাছগুলো তাদের বীজ উৎপন্ন করতে পারবে না। আবার যদি গুবরে পোকার মতো শিকারি বিরক্ত হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে এরা যে স্বীকার এর উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে যেমন অ্যাফিড এর পরিমান ভয়াবহ রকমের বৃদ্ধি পাবে। এবং এতে করে বর্ধমান কীট এর কারণে এগুলো যে গাছের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে সেগুলোর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

 অতএব আদর্শ অর্গানিক বাগান তৈরি করার ক্ষেত্রে যথাযথভাবে বিবেচনা করে সঠিক গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে 

একটি টেকসই বাড়ির জন্য যেমন একটি শক্ত ভিত্তির প্রয়োজন তেমনি একে স্বাস্থ্যবান উদ্ভিদের জন্য মাটির প্রয়োজন যা উদ্ভিদের কি করে পানি বাতাস এবং পুষ্টি সরবরাহ করে থাকবে। যারা বাগান তৈরি করতে চায় তাদের খুব কম সংখ্যকই আদর্শ মাটি দিয়ে আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়ে থাকে।  তবে  একটি চমৎকার জমি আগে থেকে পেয়ে থাকলেও একটি পরিপূর্ণ বাগান তৈরীর জন্য মাটিকে সুস্থ রাখা এবং গাছগুলোকে সাহায্য করা একটি চলমান প্রক্রিয়া।  যেকোনো বাগান করার এবং গাছ লাগিয়ে সেগুলোর পরিচর্যার ক্ষেত্রে সফল হতে সবচেয়ে চমৎকার এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে জমি প্রস্তুত করা এবং সেখানকার মাটিকে একটি চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুস্থ রাখা। 

জমি প্রস্তুত করা বলতে বোঝায় মাটিকে জীবন দান করা। জীবাণু,  কীট, ফাঞ্জাইসহ  অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের উপাদান এবং একটি আদর্শ পরিবেশ মাটিকে দেয়া যাতে করে সেটি নিজের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারে।  কোন কিছু ফেরত না দিয়ে মাটির কাছ থেকে ক্রমাগত নিতে থাকলে সেটি প্রাকৃতিক চক্রকে ভেঙে দেয় এবং পরবর্তীতে এর ফলাফল ভাল হয় না। শস্য কেটে ফেললে,  মাটির ঘাস ছোট করে কেটে সেগুলোকে সরিয়ে ফেললে  অথবা যে পাতাগুলো জমিতে পড়ে সেগুলো পরিষ্কার করে ফেললে মাটিতে জৈব পদার্থ গুলো সরিয়ে ফেলা হয় কারণ এগুলো মাটিতে গিয়ে জৈব পদার্থ হিসেবে কাজ করার কথা।  যদি জমির জন্য যথেষ্ট  জৈব পদার্থ ব্যবহার করা হয় তবে ধীরে ধীরে মাটির স্বাস্থ্য নিম্নমুখী হতে থাকে। প্রাকৃতিক ভাবে যে পুষ্টি উপাদানগুলো গাছের দরকার সেগুলোর পরিবর্তে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে গাছের পুষ্টির অভাব পূরণ হতে পারে কিন্তু এটি  ব্যবহারে জমির প্রাকৃতিক এবং জৈব পদার্থের অভাব পূরণ হয় না। 

জমি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সচরাচর ব্যবহার করা একটি প্রক্রিয়া। জৈব পদার্থের জন্য কম্পোস্ট সার একটি আদর্শ উৎস হতে পারে। এছাড়া পুরনো এবং ফসলের গাছের বাকি থাকা অংশও জৈব পদার্থের উৎস হিসেবে চমৎকার কাজ করে। জমির আদর্শ pH মান নিয়ন্ত্রণে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।  কারণ এটি মাটির জীবন প্রক্রিয়া এবং মাটি থেকে উদ্ভিদ কেমন পরিমাণ পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারবে সেটিকে প্রভাবিত করে। 

যে কাজগুলো মাটির ক্ষতি করে সেগুলো করা থেকে বিরত থাকাও অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ।  উদাহরণস্বরূপ ভারী পা নিয়ে জমিতে হাঁটলে অথবা তার উপর দিয়ে গাড়ি চলাচল করলে এবং সার ও কীটনাশক এর ভুল প্রয়োগে  মাটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয় এবং এতে করে জমির উদ্ভিদের সহায়তা করার গুণ নষ্ট হয়ে যায়।  সেহেতু এই সবগুলো যেন বাগান করার জমিতে না ঘটে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে যাতে করে জমির ক্ষতিসাধন না হয় যেন না একটি আদর্শ জমির উপর নির্ভর করে একটি বাগান কতটা সুন্দর করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। 

 বাগান করার মৌলিক কৌশল হিসেবে জমি তৈরির এই প্রক্রিয়া গুলো খেয়াল রাখলে সহজে বাগান তৈরি করা সম্ভব হয়। 

অর্গানিক বাগান বলতে মূলত বোঝায় যে বাগান তৈরির সময় সার ও কীটনাশক এড়ানো হয়। কিন্তু অর্গানিক বাগান তৈরির আসল ব্যাপার এর চেয়েও বেশি কিছু বোঝায়। অর্গানিক খাবার, ফলমূল এবং জমি একত্রে পরিবেশের সাথে চমৎকার সহাবস্থানে থাকতে সাহায্য করে। অনেকের জন্যই অর্গানিক উপায়ে বাগান প্রস্তুত করা জীবনের অন্যতম একটি মাধ্যম। 

অর্গানিক বাগান কী?

মাটি, পানি ও বাতাস মানুষের সাথেসাথে গাছ, পোকামাকড়, পাখি ও প্রাণীদেরকেও প্রভাবিত করে। অর্গানিক উপায়ে বাগান মূলত বিষাক্ত নয় এমন পদ্ধতিতে বাগান করার সময়কার সমস্যা দূর করার দিকে মনোযোগ দেয়। যারা অর্গানিক বাগান তৈরীর ক্ষেত্রে নিবেদিতপ্রাণ তারা এটি তৈরির  সময় কিছু প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে থাকে। 

যারা অর্গানিক উপায়ে  বাগান করে তারা সাধারনত জমি চাষ করার ক্ষেত্রে জমির বাস্তুতন্ত্র রক্ষার্থে জৈব পদার্থ ব্যবহার করে যেমন কম্পোস্ট সার।  এক্ষেত্রে তারা কীটনাশক ও সার ব্যবহার করেনা কারণ এগুলো মাটির জন্য ক্ষতিকর।  এবং  মাটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া এই জৈব পদার্থ গুলো কে ভেঙে সেখান থেকে উদ্ভিদের জন্য পুষ্টি উপাদানগুলো সরবরাহ করে থাকে।

উন্মুক্ত থাকা মাটির বৃষ্টি বা বাতাসের কারণে ক্ষয় হতে পারে। যারা অর্গানিক উপায় বাগান তৈরী করতে চান তারা সাধারণত গাছের শিকড়ের চারপাশে ঘর পাতা ইত্যাদি উপাদান দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন যাতে করে মাটির মতো এই মহামূল্যবান সম্পদ এর কয় না হয়। 

যারা অর্গানিক উপায় বাগান তৈরি করে তারা সাধারণত কিট এবং অসুখ কমানোর জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করে।  এক্ষেত্রে তারা সার ও কীটনাশক এর ব্যবহার কমিয়ে গাছের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অংশ কেটে এবং ছাঁটাই করে থাকে।  এছাড়াও তারা অনেক সময় গাছগুলো রক্ষার্থে এক ধরনের আবরণ ব্যবহার করে। 

যেহেতু অর্গানিক বাগানের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় গাছ এবং সচেতনভাবে সার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে সেহেতু যারা অর্গানিক বাগান তৈরি করেন তারা একটি স্বাস্থ্যসম্মত বাস্তুসংস্থানের ব্যবস্থা করেন যেখানে বিভিন্ন উপকারী কীট এসে বাসা বাঁধতে পারে। 

যারা অর্গানিক বাগান তৈরি করেন তারা তাদের সমস্ত উপাদান প্রকৃতি থেকেই নিয়ে থাকেন।  তারা কৃত্রিম কীটনাশক স্প্রে এর বরং লক্ষ্য রাখেন বাগানে কখন কোন ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সে অনুযায়ী তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে গাছের অসুখ কিংবা কীটপতঙ্গ জনিত সমস্যা দূরীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি আপনার বাগানে কখনো সাদা প্রজাপতি উড়তে দেখেন তাহলে যত দ্রুত সম্ভব আপনাকে কীটের হাত থেকে বাগানের ব্রোকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি বাঁচানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুয়োপোকা ডিম পাড়ার পড়ে কীটনাশক স্প্রে করার চাইতে প্রথমেই আপনার গাছগুলোকে বিশেষ কাপড় দিয়ে ঢেকে গাছের আশেপাশে এই ডিমপাড়া রোধ করতে পারেন। 

 অর্গানিক উপায়ে যারা বাগান তৈরি করেন তারা এটিকে একটি জীবন্ত বাস্তুসংস্থান হিসেবে চিন্তা করে প্রকৃতির সাথে একাত্মতা রেখে একটি চমৎকার পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করতে পারেন।